মাকে হত্যা করে প্রতিবেশীকে ফাঁসানোর চেষ্টা, ৩ বছর পর কারাগারে মেয়ে
১ ঘন্টা আগে বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬
কিশোরগঞ্জের
করিমগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীদের হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি
দখলের উদ্দেশ্যে সহযোগীদের নিয়ে নিজের মাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মেয়ের বিরুদ্ধে। ঘটনার
প্রায় সাড়ে তিন বছর পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো
অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে চম্পা (৪৮) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক
জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
বৃহস্পতিবার
(২০ আগস্ট) কিশোরগঞ্জ পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো
হয়।
পিবিআই
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার সিন্দ্বীপ গ্রামের নিজ
বসতঘরে ঘুমিয়ে পড়েন মোছা. হালিমা (৬৫)। পরদিন সকালে ঘুম থেকে না ওঠায় তাঁর মেয়ে চম্পা
ঘরের সামনে গিয়ে দেখতে পান, দরজায় বাইরে থেকে শিকল লাগানো। মাকে ঘরে না পেয়ে শিকল ভেঙে
ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি। পরে বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরের একটি পতিত জমিতে হালিমার
মরদেহ পড়ে থাকার খবর পান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখা
হয়েছে। নাক ও মুখে রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন এবং গলায় সাদা রশি পেঁচানো ছিল।
এ
ঘটনায় চম্পা বাদী হয়ে ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ করিমগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায়
পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
পরবর্তী
সময়ে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হলে সংস্থাটি তদন্তভার গ্রহণ করে তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি,
গোয়েন্দা তথ্য এবং পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মামলার বাদী চম্পার
ভূমিকা নিয়ে তদন্তকারীদের সন্দেহ তৈরি হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডে
নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
তদন্তে
পিবিআই জানতে পারে, প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিবেশী বিল্লালের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ
বাড়ির জায়গা কেনার দাবি করেছিলেন হালিমা। তবে ওই জমির কোনো দলিল হয়নি। পরবর্তী সময়ে
বিল্লাল জমিটি অন্য একজনের কাছে বিক্রি করলে জায়গাটি নিয়ে হালিমার সঙ্গে তাঁর বিরোধ
সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়া ও মারামারির ঘটনাও ঘটে।
পিবিআইয়ের
ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ দিন আগে পূর্বশত্রুতার জেরে বিল্লাল হালিমাকে
মারধর করেন। পরে তাঁকে করিমগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি
বিল্লালসহ প্রতিবেশীদের হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিরোধপূর্ণ জমিটি নিজেদের দখলে নেওয়ার
উদ্দেশ্যে চম্পা সহযোগীদের নিয়ে মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা
অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাত ১১টার দিকে চম্পার সহযোগীরা তাঁদের বাড়িতে আসে। চম্পা
আগের বিরোধ মীমাংসার কথা বলে তাঁর মাকে ঘর থেকে ডেকে বের করেন। পরে সহযোগীরা হালিমাকে
নিয়ে গিয়ে হত্যা করে এবং মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখে বলে পিবিআই জানিয়েছে।
এরপর
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চম্পা প্রতিবেশী বিল্লালসহ অন্যদের আসামি করে করিমগঞ্জ থানায়
হত্যা মামলা দায়ের করেন। উদ্দেশ্য ছিল, হত্যাকাণ্ডের দায় প্রতিবেশীদের ওপর চাপিয়ে তাঁদের
আইনি জটিলতায় ফেলা এবং বিরোধপূর্ণ জমি দখলের পথ তৈরি করা।
পিবিআই
জানায়, তদন্তের একপর্যায়ে চম্পা নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন। গত ১৮ আগস্ট ফৌজদারি
কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
পিবিআই
কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ বলেন, “জমি নিয়ে পূর্বশত্রুতার
জেরে প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি দখলের আশায় নিজের মাকে সহযোগীদের
মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত জঘন্য ও গর্হিত অপরাধ।”
তিনি
আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপনের লক্ষ্যে
তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।