কুষ্টিয়ার জগতির সেকাল-একাল বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন

৬ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:০৪ am

 

বর্তমান প্রতিদিন ডেস্ক:
১৮২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জর্জ স্টিফেনসনের আবিষ্কৃত বিশ্বের প্রথম স্টিম ইঞ্জিন রেলের যাত্রা শুরু হয়। ‘লোকোমোশান’ নামের সেই ট্রেনটি ব্রিটেনের স্টকটন থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরের ডালিংটন পর্যন্ত গিয়েছিলো, প্রথম চালক ছিলেন জর্জ স্টিফেনসন নিজেই। ওই সময়টাতে বিশ্বজুড়েই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে রেলপথের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা ভারতও এদিক দিয়ে পিছিয়ে ছিলো না। রাজনৈতিক ও ভৌগলিক সুবিধা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে ব্রিটিশ সরকার সেই সময়েই ভারতে রেলপথ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলো।

 

 কুষ্টিয়ার জগতির সেকাল-একাল বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন

                           উপমহাদেশের প্রথম রেলপথ দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে

 

কয়েক বছর পর ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল পেনিনসুলার রেলওয়ে নামক কোম্পানির নির্মিত প্রথম যাত্রীবাহী বাষ্পচালিত ট্রেন ইঞ্জিন ভারতীয় উপমহাদেশে যাত্রা শুরু করে। মুম্বাইয়ের বোরিবন্দর থেকে থানে পর্যম্ত ৩৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় ৪০০ জন যাত্রী নিয়ে। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৫৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া থেকে হুগলি পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রেলপথ চালু করার মধ্য দিয়ে বাংলায় প্রথম রেলপথের সূচনা হয়। এরপর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পশ্চিম বাংলার রাজধানী কলকাতার শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত ব্রডগেজ (৫ ফুট ৬ ইঞ্চি) রেলপথ চালু করে।

শিয়ালদহ থেকে রানাঘাট পর্যন্ত যে রেলপথ চালু করা হয়েছিলো, সেটাকে সেই বছরেই বর্ধিত করে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার (সাবেক নদীয়া) জগতি পর্যন্ত ৫৩.১১ কিলোমিটার দীর্ঘ করা হয়। তারপর ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর কলকাতার শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পশ্চিম বাংলার গেদে–বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত পার হয়ে সরাসরি ট্রেন এসেছিলো বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে জগতি পর্যন্ত।

 

কুষ্টিয়ার জগতির সেকাল-একাল বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন

                                  অ্যাকশন ক্যামেরায় জগতি স্টেশন

 

ঢাকার সাথে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করার জন্য প্রায় ১০ বছর পর ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারি জগতি রেলস্টেশন থেকে বর্তমান রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত ট্রেন চালু করা হয়। তখনকার সময় এই পথেই সহজে কলকাতা থেকে ঢাকা বা ঢাকা থেকে কলকাতা আসা-যাওয়া করা যেত। কলকাতা থেকে মানুষ ট্রেনে করে জগতি স্টেশন পার হয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে নামত এবং স্টিমারে পদ্মা নদী পার হয়ে ঢাকায় চলে আসত।

মূলত তৎকালীন সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এই অঞ্চল বেশ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আর কলকাতা-রানাঘাট রেলপথের বেশ কাছাকাছি হওয়ায় প্রথম রেল যোগাযোগ এদিক দিয়েই স্থাপন করা হয়। এরপর ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মোহিনী মিল’, যেটা ছিলো সেই সময়ের সমগ্র এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় কাপড়ের মিল। কলকাতার সাথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকার কারণে এত বড় কাপড়ের কল এখানে চালু হতে পেরেছিলো।

স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তানের সময়ে জগতিতে ‘কুষ্টিয়া চিনিকল’ প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে আখ সরবরাহের কাজে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো এই জগতি স্টেশন। কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ার আশপাশের জেলাগুলোতে আসা ধান, পাট, গম, আখ কিংবা অন্যান্য পণ্যসামগ্রীও খালাস হতো এই জগতি স্টেশনেই। এসব কারণেই প্রতিষ্ঠার পরেই এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ‘জগতি স্টেশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন ‘কয়লা’ পুড়িয়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ঝক ঝক শব্দে স্টিম ইঞ্জিনের (বাষ্পচালিত) রেলগাড়ি এসে এই স্টেশনে থামতো, রেলগাড়ি কেমন সেটা দেখতেও আশপাশের মানুষজনের ভিড় এখানে লেগেই থাকতো।

 

কুষ্টিয়ার জগতির সেকাল-একাল বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন

                 শুধুমাত্র লোকাল ট্রেন থামে। সবসময়ই প্রায় যাত্রীশূন্য থাকে

 

ব্রিটিশরা কুষ্টিয়ার জগতিতে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আরো কিছু অবকাঠামো এখানে গড়ে তুলেছিলো। লাল ইট দিয়ে নির্মাণ করেছিলো দোতলা স্টেশন ভবন। এখন অবশ্য ঐতিহ্যমণ্ডিত এই স্টেশন ভবনটি এক রকম পরিত্যক্তই বলা যায়। ভবনে ফাটল ধরায় উপরতলাতে কেউ যায়নি বহুবছর। অনেকদিন আগেই যাত্রীদের সুবিধার জন্য তৈরি করা ওয়েটিং রুমও ভেঙে গেছে। আবার প্লাটফর্মের ইটও ভেঙে গেছে আর গাঁথুনিও ক্ষয়ে গেছে। স্টিম ইঞ্জিনে পানি দেওয়ার জন্য প্লাটফর্মের দুই পাশে নির্মাণ করা হয়েছিলো বড় দুটি ওভারহেড পানির ট্যাংক, সেগুলোও অনেকদিন আগেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এই ট্যাংক দুটিতে সেই সময় কয়লার ইঞ্জিনে চলা পাম্প দিয়ে মাটির নিচে থেকে পানি তোলা হতো।

 

                                                    অকেজো টেলিফোন

 

তাছাড়া ঘরের ভেতরে সেই আমলের বেশ কিছু আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। অকেজো টেলিফোন থেকে শুরু করে সেই সময়ে ব্যবহার হওয়া সব যন্ত্রাংশই এখন বাতিলের খাতায়। টিকিট কাটা ঘরের পরিত্যক্ত জানালা, টাকা রাখার লকার, ট্রেনকে সিগন্যাল দিতে লকারের উপরে বসানো ল্যাম্প- সবই এখন স্মৃতি। আগে যেখানে স্টেশনজুড়ে জ্বলতো চকচকে আলো, চারদিকে গিজিগিজ করতো মানুষ, আবার গাড়ি থেকে মালপত্র ওঠানো আর নামানোর কাজে ব্যস্ত থাকতো কুলিরা, আজ সেখানে স্টেশনজুড়ে নির্জনতা, সন্ধ্যা হলেই ভূতুড়ে পরিবেশ।

জগতি স্টেশনের এই অচলাবস্থার মূল কারণ এখানে কোনো স্টপেজ না থাকা। কুষ্টিয়া শহরের দুটি রেল স্টেশন এখান থেকে মাত্র ২-৩ কিলোমিটার দূরে, আবার পোড়াদহ জংশনও জগতি থেকে খুব কাছে। এই স্টেশনে না থেমে এর ওপর দিয়ে চলে যায় রাজশাহী থেকে গোয়ালন্দ ঘাটগামী আন্তঃনগর ট্রেন মধুমতি এক্সপ্রেস আর রাজশাহী থেকে গোপালগঞ্জগামী টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস।

 

                                          টিকিট কিনতে এখানে কেউ আর লাইন দেয় না

 

এখানে শুধুমাত্র স্টপেজ রয়েছে সরকারের লিজ দেয়া খুলনা থেকে গোয়ালন্দ ঘাটগামী মেইল ট্রেন নক্সিকাঁথা এক্সপ্রেস আর পোড়াদহ থেকে গোয়ালন্দ ঘাট চলাচলকারী শাঁটল ট্রেনের। এই দুটি ট্রেনের খুব অল্প সংখ্যক যাত্রী এই স্টেশন থেকে ওঠা-নামা করে। শুধুমাত্র ট্রেন আসার কিছু সময় আগে স্টেশন মাস্টারের ঘরটি খোলা পাওয়া যায়, আবার ট্রেন ছাড়ার পরেই সেটা বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রী ছাউনিতে বসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের প্লাটফর্মের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

প্রায় মাসখানেক আগে যখন খোঁজ নিয়েছিলাম, তখন এই স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলো মাত্র পাঁচজন। এদের মধ্যে ছিলো একজন স্টেশন মাস্টার, তিনজন পয়েন্সম্যান আর একজন গেটম্যান। তাদের কথামতে, এখানে আরো ১২-১৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরেই ফাঁকা রয়েছে। এই এলাকার বয়স্ক কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা নাকি ছোটবেলায় ২০-২২ জন কর্মচারীকে ব্যস্ত দিন-রাত পার করতে দেখেছেন। রেলস্টেশনের সাথেই গড়ে উঠেছে জগতি বাজার, অল্প কিছু দোকানপাট রয়েছে সেখানে।

 

                 স্টেশনের সাথেই ছোট বাজার, রাস্তার দু’পাশেই দোকানপাট গড়ে উঠেছে

 

এখনও মাঝেমধ্যে এখানে ভারত থেকে কয়লা, পাথর নিয়ে আসা মালবাহী ট্রেনের দেখা পাওয়া যায়। একসময় স্টেশনের অনেক জমি থাকলেও এখন খুব বেশি জমি অবশিষ্ট নেই। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম স্টেশনটি একে একে পার করে ফেলেছে ১৫৬ বছর। অযত্ন, অবহেলায় ধীরে ধীরে বাতিল হতে থাকা এই স্টেশনটি রেলসেবা প্রদানের জন্য রেল মন্ত্রণালয়ের কাছে লাভজনক না হলেও ঐতিহাসিকভাবে জগতি স্টেশন অনেক গুরুত্ব বহন করে। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্ত্রাসী নিহত

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্ত্রাসী নিহত

বর্তমান প্রতিদিন ডেস্ক: কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মিরাজ হাসান টেনি (৩০) নামে এক সন্ত্রাসী নিহত হয়েছেন। এ সময় উদ্ধার করা হয় ১টি বিদেশি পিস্তুল, বিস্তারিত →

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাসহ ১০ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের উদ্বোধন

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাসহ ১০ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের উদ্বোধন

এস এম জামাল: কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলাসহ দেশের ১০ উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ১০ টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচী উদ্বোধন বিস্তারিত →

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে ১৫ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ী আটক

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে ১৫ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ী আটক

বর্তমান প্রতিদিন ডেস্ক : কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে রবিবার ভোর ৫টার দিকে ১৫ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছেন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিস্তারিত →

কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় মোবাইল চুরির অপবাদে গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন, ভিডিও

কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় মোবাইল চুরির অপবাদে গাছের সাথে বেঁধে নির্যাতন, ভিডিও

বর্তমান প্রতিদিন ডেস্ক : কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় মোবাইল চুরির অপবাদে আমগাছের সাথে বেঁধে দুই শিশুকে অমানসিকভাবে পিটিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এ নির্মম ঘটনা ঘটে গত বুধবার বিকেলের বিস্তারিত →

কুষ্টিয়ার মিরপুরে একটি গাছের নিচে থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

কুষ্টিয়ার মিরপুরে একটি গাছের নিচে থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

বর্তমান প্রতিদিন ডেস্ক : আজ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় মোশারফ হোসেন (৫৫) নামে এক ব্যক্তির মরদেহলাশ উদ্ধার করেছেন পুলিশ। আজ রবিবার (১৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার বিস্তারিত →

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

সর্বশেষ খবর

Archives

SatSunMonTueWedThuFri
  12345
20212223242526
27282930   
       
      1
       
    123
18192021222324
       
      1
16171819202122
30      
     12
       
    123
       
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
2345678
30      
     12
       
    123
25262728   
       
      1
2345678
9101112131415
3031     
      1
30      
   1234
567891011
       
Surfe.be - cheap advertising